ভালোবাসা, সংস্কৃতি ও ক্রিকেটের এক যাত্রা: বাংলাদেশে শেহান মালিক

৯৭ প্রতিবেদক:

প্রকাশ: 3 ঘন্টা আগে আপডেট: 2 মিনিট আগে
ভালোবাসা, সংস্কৃতি ও ক্রিকেটের এক যাত্রা: বাংলাদেশে শেহান মালিক

ভালোবাসা, সংস্কৃতি ও ক্রিকেটের এক যাত্রা: বাংলাদেশে শেহান মালিক

ভালোবাসা, সংস্কৃতি ও ক্রিকেটের এক যাত্রা: বাংলাদেশে শেহান মালিক

শেহান মালিক একজন বহুমাত্রিক শ্রীলঙ্কান শিল্পী, অভিনেতা, কনটেন্ট নির্মাতা, টিভি উপস্থাপক এবং ক্রীড়া সাংবাদিক- যিনি গল্প বলা, ভ্রমণ এবং মানবিক সংযোগের মধ্যে এক সেতুবন্ধন তৈরি করেছেন।

ভারত, বাংলাদেশ এবং পাকিস্তানজুড়ে তাঁর ভাইরাল কনটেন্টের জন্য পরিচিত শেহান তাঁর ক্যারিশম্যাটিক উপস্থিতির মাধ্যমে দর্শকদের মুগ্ধ করেছেন, অনস্ক্রিন এবং অনলাইন- উভয় ক্ষেত্রেই। তিনি শ্রীলঙ্কার টেলিড্রামায় অভিনয় করেছেন এবং টিভি সুপ্রিমে কাজ করেন, ফলে তিনি দেশটির বিনোদন জগতে একটি পরিচিত মুখ।

শ্রীলঙ্কা থেকে বাংলাদেশ: এক গল্পের শুরু

শেহানের বাংলাদেশ যাত্রা শুরু হয়েছিল বন্ধুত্ব দিয়ে। শ্রীলঙ্কা সফরের সময় আসিফ হাসান ও শেহান কনটেন্ট ও সংস্কৃতির প্রতি অভিন্ন আগ্রহ থেকে পরিচিত হন। সেই বন্ধুত্বই একসময় আমন্ত্রণে রূপ নেয়- বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগ (বিপিএল) কভার করার জন্য একজন ক্রীড়া সাংবাদিক হিসেবে বাংলাদেশে আসা।

যা শুরু হয়েছিল পেশাগত দায়িত্ব হিসেবে, তা খুব দ্রুতই রূপ নেয় সংস্কৃতি, মানুষ ও ভালোবাসার এক ব্যক্তিগত অনুসন্ধানে।

“আমি কৌতূহল ও উত্তেজনা নিয়ে এসেছিলাম, কী পাব জানতাম না। কিন্তু বাংলাদেশে পা রাখার পর মানুষজনের যে আন্তরিকতা অনুভব করেছি, তা আমার কল্পনারও বাইরে,” শেহান স্মরণ করেন।

বাংলাদেশি সংস্কৃতির অভিজ্ঞতা

শেহানের কাছে বাংলাদেশ ছিল এক নতুন আবিষ্কার। শুরুতে তাঁর ধারণা ছিল, হয়তো দেশে ভ্রমণের স্থান বা ঐতিহাসিক গুরুত্ব কম। কিন্তু সেই ধারণা দ্রুতই বদলে যায়। ঢাকার ব্যস্ত রাস্তাঘাট থেকে সিলেটের শান্ত প্রাকৃতিক সৌন্দর্য- সব মিলিয়ে বাংলাদেশ তাঁকে দিয়েছে ইতিহাস, প্রকৃতি, জীবন্ত সংস্কৃতি এবং আত্মাকে ছুঁয়ে যাওয়া অভিজ্ঞতা।

বিশেষ করে সিলেট তাঁর মনে গভীর ছাপ ফেলেছে। ঢেউ খেলানো চা-বাগান, সবুজে ঘেরা পরিবেশ এবং প্রশান্ত আবহ তাঁকে শ্রীলঙ্কার কথা মনে করিয়ে দিয়েছে, জাগিয়েছে স্বস্তি ও নস্টালজিয়ার অনুভূতি। প্রকৃতি, বিশেষ করে সবুজ প্রকৃতি, তাঁর যাত্রার সবচেয়ে স্মরণীয় দিক হয়ে ওঠে।

প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের পাশাপাশি, বাংলাদেশের আতিথেয়তায়ও তিনি গভীরভাবে মুগ্ধ হন।

“একজন দোকানদার আমাকে নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছে দিতে তিন কিলোমিটার হেঁটে গিয়েছিলেন। এটাই বাংলাদেশের আসল পরিচয়- নিঃস্বার্থতা, আন্তরিকতা এবং সরলতা,” তিনি বলেন।

ক্রিকেট, সংস্কৃতি ও সংযোগ

বাংলাদেশের ক্রিকেটপ্রেমও শেহানের সফরের অন্যতম আকর্ষণ ছিল। বিপিএল কভার করতে গিয়ে তিনি দেখেছেন, ক্রিকেটের প্রতি এই দেশের আবেগ শ্রীলঙ্কার মতোই তীব্র। দুই দেশের ভক্তরাই অত্যন্ত নিবেদিত, তবে বাংলাদেশের স্টেডিয়ামগুলোতে যে উচ্ছ্বাস দেখা যায়, সেটিকে তিনি “বিদ্যুৎময়” বলে বর্ণনা করেন।

বাংলাদেশ ও শ্রীলঙ্কার সংস্কৃতির কিছু মিল ও অমিলও তিনি লক্ষ্য করেন। দুই দেশেই ক্রিকেট, খাবার এবং প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের প্রতি ভালোবাসা রয়েছে। তবে বাংলাদেশি খাবার তাঁর কাছে ছিল ভিন্ন স্বাদের এক অভিজ্ঞতা- বিশেষ করে রান্নায় নারকেল তেলের বদলে সয়াবিন তেলের ব্যবহার।

তাঁর প্রিয় খাবারের তালিকায় ছিল—দেশি মুরগি, বোরহানি, বাবর খানি, মিষ্টি দই এবং ভুনা খিচুড়ি।

১৯৭১ সালের স্বাধীনতার ইতিহাস, ভাষাগত বৈচিত্র্য এবং সংস্কৃতি রক্ষার প্রতি সম্মিলিত শ্রদ্ধা তাঁর ওপর গভীর প্রভাব ফেলেছে।

“বাংলাদেশিরা তাদের ভাষা ও সংস্কৃতি রক্ষার জন্য লড়াই করেছে। ধর্ম নির্বিশেষে এই গর্ব ও ঐক্য সত্যিই অনুপ্রেরণাদায়ক,” তিনি বলেন।

আইসিসি টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ ২০২৬: বৈশ্বিক মঞ্চে

শেহানের দক্ষতা তাঁকে বৈশ্বিক ক্রিকেট মঞ্চেও নিয়ে গেছে। আইসিসি টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ ২০২৬-এর অফিসিয়াল উপস্থাপক হিসেবে তিনি তাঁর স্বতন্ত্র গল্প বলার ধরন ও ব্যক্তিত্ব দিয়ে আন্তর্জাতিক দর্শকদের মুগ্ধ করেছেন, যেখানে ক্রীড়া সাংবাদিকতার সঙ্গে সংস্কৃতির দৃষ্টিভঙ্গির এক সুন্দর সমন্বয় ঘটেছে।

বিপিএল ও এলপিএল: কিছু প্রতিফলন

বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগ (বিপিএল) এবং লঙ্কা প্রিমিয়ার লিগ (এলপিএল)—দুই লিগই কভার করার অভিজ্ঞতা থেকে শেহান কিছু মিল ও পার্থক্য খুঁজে পেয়েছেন। এলপিএল যেখানে ছোট পরিসরের কিন্তু প্রাণবন্ত, সেখানে বিপিএল ভক্তদের অসাধারণ সম্পৃক্ততা, তৃণমূল পর্যায়ের উৎসাহ এবং স্থানীয় সংস্কৃতির সঙ্গে গভীর সংযোগ তুলে ধরে।

ক্রিকেটের প্রতি ভালোবাসা সীমান্ত ছাড়িয়ে গেলেও, প্রতিটি লিগের নিজস্ব স্বাদ রয়েছে।

এক স্থায়ী সংযোগ

শেহান মালিকের বাংলাদেশ সফর ছিল শুধু কাজ নয়—এটি ছিল মানুষ, বন্ধুত্ব, সংস্কৃতি এবং ভালোবাসার এক যাত্রা। বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস থেকে শুরু করে নীরব চা-বাগান—সব জায়গা থেকে তিনি যে গল্প ও সম্পর্ক সংগ্রহ করেছেন, তা তাঁর জীবনের অমূল্য সম্পদ হয়ে থাকবে।

“বাংলাদেশ আমাকে বন্ধুত্ব, সংস্কৃতি, ইতিহাস এবং এমন খাবার দিয়েছে যা আমি কখনো ভুলব না। আমি খুব শিগগিরই আবার ফিরব, এবং এই অসাধারণ দেশের গল্প বলতে থাকব,”- এই কথাতেই তিনি তাঁর অনুভূতির সমাপ্তি টানেন।